Habiganj Charukola Academy হবিগঞ্জ চারুকলা একাডেমি

Habiganj Charukola Academy হবিগঞ্জ চারুকলা একাডেমি
✅ Greetings From The most prominent art school in Habiganj Charukola Academy. Geographically, it is in the center of Habiganj Sodar.

শিশু শিক্ষায় চারু-কারুকলা গুরুত্বপূর্ণ পৃথিবীজুড়ে

 

পৃথিবীজুড়ে শিশু শিক্ষায় চারু-কারুকলা গুরুত্বপূর্ণ






চারু ও কারুকলা ভিন্ন ধরনের শিখন-শেখানো কার্যক্রম। এর সঙ্গে শ্রেণিকক্ষ, পাঠ্যপুস্তক, পরীক্ষা ইত্যাদির তেমন কোনো সম্পর্ক নেই। এর সঙ্গে সাহিত্যবোধের সম্পর্ক আছে। তবে বেশি সম্পর্ক শিল্পের সঙ্গে, ললিতকলার সঙ্গে ও সংস্কৃতির সঙ্গে। প্রাতিষ্ঠানিক শিখন-শেখানো কার্যক্রমের সঙ্গে ভাষা গভীরভাবে জড়িত। বলা যায়, ভাষা ছাড়া শিখন-শেখানো কার্যক্রম অচল। বিশেষ করে, শিশু শিক্ষায় মাতৃভাষার গুরুত্ব অপরিসীম। কিন্তু চারু ও কারুকলার সঙ্গে ভাষার তেমন কোনো সম্পর্ক নেই। অধিকন্তু বলা যায়, চারু ও কারুকলা নিজেই একটি ভাষা, নিজেই একটি সংস্কৃতি। ফলে অনিবার্যভাবে পৃথিবীজুড়ে শিশু শিক্ষায় চারু-কারুকলা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে এসেছে।



বিশেষ করে, শিশুরা যখন পড়তে শেখে না বা লিখতে শিখে না, তখন থেকেই শুরু হয় চারু ও কারুকলার পাঠ। চারুকলার এই পাঠকে শিশু শিক্ষায় সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব আরোপ করা হয় এই কারণে যে, এই শিক্ষার সঙ্গে শিক্ষার্থীর আবেগ জড়িত থাকে, তার সাইকোমটর বা মনোদৈহিক দক্ষতা উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে এবং তার মধ্যে এক ধরনের সাংস্কৃতিক সচেতনতা তৈরি করে। প্রতিনিয়ত সে নতুন নতুন সৃষ্টির ভেতরে অবগাহন করে। তার মধ্যে নানারকম আকার-আকৃতি ও গাণিতিক ধারণা স্পষ্ট করে তোলে এবং নিজেকে উন্মুক্তভাবে প্রকাশ করার দরজা জানাগুলো তার সামনে উন্মোচিত হয়ে যায়। ফলে তার মধ্যে এক ধরনের সৌন্দর্যবোধ, রুচিবোধ, মাত্রাবোধ ও সংবেদন তৈরি হয়।


আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে, শিশুদের চারু ও কারুকলায় জ্ঞান দান করে পরীক্ষায় ভালো করার কোনো সম্ভাবনা নেই। কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাই রাতারাতি ফল লাভের নিশ্চয়তা দেয় না। কারণ, শিক্ষার স্বভাবটাই এমন যে, মধু সঞ্চয়ের জন্য মৌমাছিকে যেমন নিরন্তর প্রচেষ্টায় ও দীর্ঘ অপেক্ষায় থাকতে হয়, শিক্ষার মধু লাভ করার জন্যও তেমনি নিরন্তর অনুধ্যান ও অপেক্ষায় থাকতে হয়। এর ফলে শরীর ও মনে জমতে থাকে মানবরসে অভিষিক্ত একজীবন। সুতরাং ওই ধারণা মোটেই সঠিক নয়। শিশুকে মানবিক মানুষ হিসেবে, হৃদয়বান মানুষ হিসেবে, সংস্কৃতিমনস্ক মানুষ হিসেবে, দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলার জন্য চারু ও কারুকলার শিক্ষা তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা রাখে।




ছবি আঁকতে গিয়ে এবং কাগজ ও অন্যান্য উপকরণ দিয়ে কোনো কিছু বানাতে গিয়ে শিশুরা বেশ কিছু চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়। সেই চ্যালেঞ্জগুলো হলো রং ব্যবহারের চ্যালেঞ্জ, আকার-আকৃতি ইত্যাকার মাপজোক-সংক্রান্ত চ্যালেঞ্জ এবং বিচিত্র গড়ন ঠিক করার ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জ। এসব ক্ষেত্রে শিশুরা সমস্যা সমাধানের নিজস্ব যোগ্যতা ও প্রত্যুৎপন্নমতিত্ব ব্যবহার করে। ফলে অনিবার্যভাবেই ধীরে ধীরে তার মধ্যে এই সব দক্ষতা বাড়তে থাকে এবং শিশু আত্মবিশ্বাসী হয়ে ওঠে। চারু ও কারুকলার এসব কাজ শেষ করার পর শিশুরা যখন বাবা-মা, ভাই-বোন, আত্মীয়-স্বজন কিংবা শিক্ষকদের কাছ থেকে প্রশংসামূলক সমর্থন পায়, তখন তার আত্মবিশ্বাস আরও বাড়তে থাকে। এই আত্মবিশ্বাস যে শেষ পর্যন্ত শুধু চারু ও কারুকলার ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ থাকে তা নয়, অধিকন্তু পরবর্তী পর্যায়ের প্রাতিষ্ঠানিক শিখন-শেখানো কার্যক্রম থেকে শুরু করে শিশুর জীবনযাপনের প্রতিটি ক্ষেত্রে তার এই শৈল্পিক দক্ষতা এবং সমস্যা-সমাধানের দক্ষতাকে ব্যবহার করতে পারে।



আমাদের শিক্ষিত পরিবারগুলোতে অনেক সময় দেখা যায়, মা-বাবা, ভাই-বোন কিংবা অন্য কোনো আত্মীয়-স্বজনের জন্মদিনে উপহারের জন্য শিশুরা নিজ হাতে জন্মদিনের কার্ড তৈরি করে। অন্যকে খুশি করার এই বোধ পৃথিবীর সব দেশের চারু ও কারুকলার শিশুদের মধ্যে পরিলক্ষিত হয়। আবার অনেক সময় নিজের পড়ার ঘরটিকে, শোবার ঘরটিকে কিংবা ডাইনিং ও ড্রয়িং রুমটিকে নিজের আঁকা নানা রকম ছবি দিয়ে সুসজ্জিত করে তোলে শিশুরা। লক্ষ করলে দেখা যাবে, শিশুরা গভীর নিষ্ঠা, মনোযোগ ও সৃষ্টিশীলতার সমন্বয়ে, খুব আনন্দের সঙ্গে এই কাজগুলো করে থাকে। এসব কাজে শিশুরা নানা রকমের উপকরণ ব্যবহার করে। এসব উপকরণ অধিকাংশ ক্ষেত্রে সে নিজেই সংগ্রহ করার চেষ্টা করে। কখনো কখনো বাবা-মা ও ভাই-বোনের মাধ্যমে উপকরণগুলো সে সংগ্রহ করে। এই সামগ্রিক কর্মপরিকল্পনা ও কর্মযজ্ঞের ভেতর দিয়ে একজন শিশুর দায়িত্বশীলতা, সময়ানুবর্তিতা, আন্তরিকতা ও গভীর প্রেষণার পরিচয় মূর্ত হয়ে ওঠে। এ ধরনের শিশুরা কোনো অবস্থাতেই বাজেভাবে সময় অতিবাহিত করে না। এদের মধ্যে এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক গড়ন তৈরি হয়, যেই গড়নটি সৃষ্টিশীলতার, সংবেদনার, রুচিশীলতার ও মাত্রাবোধের।




সুতরাং যখনই আমরা একজন শিশুকে চারু ও কারুকলার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিই, তার হাতে রং এবং পেনসিল তুলে দিই, বিচিত্র রঙের কাগজ ও উপকরণ তুলে দিই, তখনই আমাদের বুঝতে হবে যে, শিশুর মনোদৈহিক, আবেগীয় ও চিন্তন দক্ষতার উন্নয়নের ক্ষেত্রে আমরা বীজ বপন করে দিলাম। ক্রমে ক্রমে এই বীজ অঙ্কুরিত হবে এবং পত্র-পল্লব, শাখা-প্রশাখা ও ফুলে-ফলে মহীরুহ রূপ ধারণ করবে।





চিন্তা ও দৃষ্টির সমন্বয় ঘটানো আলাদা একটি দক্ষতা। সাধারণত আমরা যা দেখি, তার দৃষ্টিগ্রাহ্য রূপকে অধিকাংশ সময়ই উপস্থাপন করতে পারি না। কিন্তু চারু ও কারুকলা শিক্ষায় শিশু শিক্ষার্থীদের মধ্যে এই দক্ষতা তৈরি হয়। সে যা দেখে, আঁকার সময় তার সেই দৃষ্টিগ্রাহ্য রূপ ছবির ভেতর দিয়ে উপস্থাপন করার জন্য সে গভীরভাবে মনোনিবেশ করে। ফলে সে স্পষ্টভাবে দেখতে চায় এবং বস্তুটি সম্পর্কে সে চিন্তা করতে চেষ্টা করে। তারপর ওই দৃশ্যগ্রাহ্য রূপ সে কাগজের ওপর ধারণ করে। সামগ্রিক এই প্রক্রিয়াটির ভেতর দিয়ে শিশুর দৃষ্টিভঙ্গি ও চিন্তা করার ক্ষমতাকে গভীরভাবে সমন্বিত করে। এই প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে যতই দিন অতিবাহিত হতে থাকে, ততই শিশুর চিন্তা করার দক্ষতা এবং বস্তুময় বিশ্বের আবয়বিক হিসাব-নিকাশ, জ্যামিতিক ধ্যান-ধারণা ও গাণিতিক দক্ষতা দারুণভাবে বৃদ্ধি পেতে থাকে। এই গাণিতিক দক্ষতা তাত্ত্বিক গণিতে হয়তো তেমন কোনো প্রভাব ফেলতে পারে না, কিন্তু প্রতিনিয়ত আমাদের প্রয়োজনে যে বস্তুময় জগৎ কাজে লাগে, তার সুশৃঙ্খল ও সুষ্ঠু প্রয়োগে শিশুরা দক্ষ হয়ে ওঠে। সুতরাং এই শিশুর ওপর এই মর্মে আপনি বিশ্বাস রাখতে পারেন যে, ব্যবহারিক জীবনে সে সব কাজে শৃঙ্খলা ও নান্দনিকতা বজায় রেখে সুষ্ঠুভাবে কাজ শেষ করতে পারবে।




প্রতিনিয়ত আমরা নিজেকে প্রকাশ করতে চাই। ভাষা, আচার-আচরণ ও পোশাক-পরিচ্ছদের ভেতর দিয়ে আমরা মূলত নিজেকেই তুলে ধরি। শিশুরা তার আঁকা ছবির ভেতর দিয়ে অথবা অন্য কোনো কারুকর্মের ভেতর দিয়ে নিজেকেই তুলে ধরে। নিজেকে তুলে ধরা এই যে পরিচ্ছন্নতাবোধ, এই যে আনন্দিত সৃষ্টিকর্ম ও অভিব্যক্তি, তা শিশুর জীবনকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। শিশুরা নিজেকে ভালোবাসতে শেখে, নিজের পরিবেশ ও পরিমণ্ডলকে ভালোবাসতে শেখে, মা-বাবা, ভাই-বোন, শিক্ষক-শিক্ষিকা ও আত্মীয়-স্বজনকে ভালোবাসতে শেখে এবং প্রকৃতিকে ভালোবাসতে শেখে।





চিত্রাঙ্কন ও কারুকর্মের ভেতর দিয়ে এভাবে আমরা শিশুকে ভালোবাসতে শেখাতে পারি। পুঁজি, পণ্য ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের সর্বগ্রাসী এই জীবনে একজন শিশুকে মানবিক মানুষ হিসেবে, আশাবাদী মানুষ হিসেবে ও সৌন্দর্যপ্রিয় মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার জন্য স্কুলিং শুরু হওয়ার আগেই তাকে চারু ও কারুকলায় নিয়োজিত করতে হয়। মাতা-পিতারা যদি খুব সুষ্ঠুভাবে তার সন্তানসন্ততিকে এই শিল্পকর্মের ভেতর দিয়ে বেড়ে উঠতে দেন, তাহলে এর অসাধারণ সব সম্ভাবনার জন্য, সন্তানকেন্দ্রিক মধুময় সব ফল লাভের জন্য তারা অপেক্ষা করতে পারেন। দেশ অপেক্ষা করতে পারে তার সুনাগরিকের জন্য।

লেখক: গবেষক ও প্রাবন্ধিক

Post a Comment

0 Comments